প্রিন্ট এর তারিখঃ অগাস্ট ২৯, ২০২৬, ১০:২০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ আগস্ট ২৯, ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
মাহমুদুল হাসান
সরকারের স্বার্থ রক্ষায় রাজস্ব আহরোণে আইন কানুনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতের কথা থাকলেও অনিয়ম,দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বেনাপোল কাস্টমস কর্মকর্তারা এখন ভক্ষকের ভূমিকায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি,বেনাপোল স্থলবন্দরে আমদানি কমে যাওয়া ও শুল্ক ফাঁকিবাজ চক্রের দৌরাত্ব বৃদ্ধিতে রয়েছে অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তাদের নীরব সমর্থন।
বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থপনায় সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হলেও অর্থনৈতিক ভাবে ফুলে ফেঁপে ওঠছে কতিপয় অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা,আমদানিকার ও তার মনোনীত সি এন্ড এফ এজেন্ট।
সম্প্রতি শুল্ক ফাঁকি চেষ্ঠায় বেনাপোল বন্দরে ভারত হতে আমদানিকৃত ইমিটেশন জুয়েলারী পণ্য চালাটিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আমদানিকারককে জরিমানা করলেও শুল্ক ফাঁকিবাজ চক্রের অন্যতম সদস্য আল আমিন সোহাগের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেইনী। এ ঘটনায় ব্যবসায়ীক মহল উদ্বিগ্ন ও আশংকা করছেন শুল্ক ফাঁকিবাজরা আরো উৎসাহিত হবেন।
বেনাপোল কাস্টমস সূত্রে জানা যায়,ঢাকা চকবাজারের আমদানিকারক “ টি এল ট্রেডিং”এর মালিক মোস্তাফিজুর রহমান ভারত হতে ৬৮৭ প্যাকেজ ইমিটেশন জুয়েলারী পণ্য আমদানি করে বেনাপোল বন্দরের ৪২ নং পণ্যগারে রাখে। পণ্য চালানটির মেনুফেস্ট নং-৬০১/২০২৬/ ০০৩/ ০০৪৭২৭৯/০৮ এবং নিট ওজন ১৬ হাজার ৮শত ৫৪ কেজি। আমদানিকারকের পক্ষে সি এন্ড এফ এজেন্ট প্রতিনিধি সোহাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং সেন্টারের এর মালিক আল আমিন সোহাগ পণ্য চালানটি খালাস নেওয়ার জন্য বেনাপোল কাস্টমস হাউসে কাগজপত্র দাখিল করেন।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পণ্য চালানটি পরীক্ষণ কালে দেখা যায় ঘোষণায় পণ্য চালানটির প্রকৃত আমদানি মূল্য গোপন করা হয়েছে ও ঘোষণাকৃত ওজনের চেয়েও উচ্চ শুল্ক মূল্যের ২হাজার ৪০ কেজি পণ্য বেশী রয়েছে।
এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মোঃ রাহাত হোসেন জানান,এ ঘটনায় আমদানীকারককে কাস্টমস আইন ২০২৩ অনুসারে ন্যায় নির্ণয় করে জরিমানা করা হয়েছে। শুল্ক ফাঁকি চেষ্ঠায় জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রশ্নে তিনি কোন সদউত্তর দেননী।
অভিযোগ রয়েছে বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের সহায়তা নিয়ে মাত্র ৫১ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য ঘোষণা দিয়ে ৬ কোটি টাকার পণ্য খালাস নেওয়ার মধ্য দিয়েই মূলত শুল্ক ফাঁকির চেষ্ঠা চালায় সি এন্ড এফ এজেন্ট মালিক সোহাগ। একই ভাবে সে পূর্বেও বেনাপোল কাস্টমস হতে নাম মাত্র শুল্ক পরিশোধ করে উচ্চ শুল্ক মূল্যের পণ্য চালান ছাড়িয়েছেন।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের অপর সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী ও রাজস্ব কর্মকর্তা সনজু যোগসাজশে ভারতীয় রপ্তানীকারক জি এন এক্সপোটার্স এর এক্সপোর্টকৃত ২০টির অধিক ইনস্লুটিং বার্নিস ফর কপার(এস এস কোড-৩২০৮১০২০) পণ্য চালানে( বি/ই নং- ৮৯৯৬২,৮৬৯৭৮, ৮৫৩৬৫,৮৭৭০১,৮৯৯৮২,৮৫৩৬) অনিয়ম করে আমদানিকারককে সর্বনিন্ম মূল্যধার্যে শুল্কায়নে ( ১.২০ডলার ) পণ্য খালাস দিয়েছেন।
স্থানীয় আমদানিকারকরা জানান,একাজে তারা বৈষম্যের স্বীকার হয়েছেন এবং সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে।
এসব অনিয়মের কারন জানতে বেনাপোল কাস্টস কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্ঠা চালালে ফোন কল রিসিভ না করায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নী।
বিগত ছয় মাসের বেনাপোল কাস্টমস হাউসে শুল্ক ফাঁকি চেষ্ঠার সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান দেখলে চক্ষু চড়কগাছ। গত ৯মার্চ২৬ ইং তারিখে বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্যাগারে রাখা আমদানি কারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজে মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকৃত ১৭টন পাট বীজ জব্দ করা হয়। আমদানিকারকের নিয়োগকৃত সি এন্ড এফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠান ছিলো কদর এন্ড কোং।
জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার ( এন এস আই ) দেওয়া গোপণ তথ্যে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ২০২৬ সালের ১২মার্চ রাতে বন্দরের ৩৭নং শেডে অভিযান চালিয়ে শুল্ক ফাঁকি চেষ্টায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সাফা ইমপেক্স এর বেকিং পাওডার ঘোষণায় আমদানিকৃত (মেনিফেস্ট নং- ৬০১/২০২৬/ ০০১/ ০০১৬৩৩৩/০৩) উচ্চ মূল্যের শাড়ী, থ্রিপিচ,কসমেটিক্স ও ক্যামিক্যাল আটক করে। নিয়োগকৃত সি এন্ড এফ এজেন্ট ছিলো মেসার্স হুদা ইন্টারন্যাশনাল।
গত ১৫ জুন ২০২৬ বন্দরের ২৬ নং পণ্যাগার হতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টি এস ইন্টারন্যাশনাল এর মিথ্যা ঘোষণায় আনা ১ কোটি ৫০লাখ টাকা মূল্যের শাড়ি ও ফেসওয়াশ ক্রিম আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
বেনাপোল বন্দরের ৩৪ নাম্বার কেমিক্যাল পণ্যাগারে রাখা ঢাকার কামরাঙ্গীচরের মুসলিমবাগ এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজ শিল্প কারখানার কাঁচামাল ঘোষণার আড়ালে( বি-এল-নংঃ ১৯০৪২) বিপুল পরিমান ভায়াগ্রাও ঔষধ আমদানি করলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ঐ পণ্য চালানটি আটক করে। আমদানিকারকের নিয়োগকৃত সি এন্ড এফ এজেন্ট ছিলো হায়দার অ্যান্ড সন্স।সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ কাস্টমস কর্মকর্তাদের সবুজ সংকেতে আমদানিকৃত পণ্য চালানগুলো বেনাপোল বন্দরে ঢোকানো হয়।
বড় অঙ্কের ঘুষ নিয়ে বেনাপোল কাস্টমস কর্মকর্তারা আমদানিকারকদের পণ্য খালাসে অবৈধ সুবিধা দেন যা এখন ওপেন সিক্রেট। ২০২৫সালের ৭ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন( দুদক ) বেনাপোল কাস্টমস হাউসে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৭৬ হাজার ঘুষের টাকাসহ রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার ও তার সহযোগী (এনজিও কর্মী )হাসিবুর রহমানকে আটক করে কারাগারে প্রেরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জব্দকৃত পণ্য জমা করার নামে কাস্টমস গোডাউন থেকে কোটি টাকার উচ্চ শুল্কের ভারতীয় পণ্য পাচারকালে ২২জুন ২০২৬ দিবাগত রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ বিজিবির হাতে আটক হয়ে কারাগারে যান।
বিগত ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সুরক্ষিত( লকার) ভেঙে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে ১৯ কেজি৩৩৮ গ্রাম সোনা সুপরিকল্পিত চুরি সংঘটিত হয়। সিআইডির চার্জশিটে মূল অভিযুক্ত করে এবং চুরির সাথে সরাসরি জড়িত বলে প্রমাণিত হওয়ায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বনাথ কুন্ড, ভোল্টের দায়িত্বে থাকা গুদাম ইনচার্জ আরশাদ হোসেন,ভোল্ট ইনচার্জ শাহিবুল সর্দ্দারসহ মোট বেনাপোলের ৭জন কাস্টমস কর্মকতার নামে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয় যা বিচারাধীন রয়েছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউস ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য সূত্রে জানা যায়,২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর ) নির্ধারিত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অর্থবছর শেষে ৪ হাজার ৭৩১কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। প্রতিবেদনে রাজস্ব ঘাটতির সঙ্গে কাস্টমস ব্যবস্থপনায় বিভিন্ন অনিয়ম-দূর্নীতি ওঠে এসেছে। এছাড়াও আন্ডার-ইনভয়েসিং,পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা, ডিজিটাল ওজন স্কেলের কারচুপি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস,শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য আত্নসাতের অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক বেনাপোল কাস্টমসে ছয় মাসে ১৩০টি প্রতারণার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য চোরাচালানের অভিযোগে ৪টি মামলায় ৫৭জনকে আসামী করা হলেও নেই অগ্রগতি। অপরাধ বিশ্লেষকদের বক্তব্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর কঠোর নজরদারীর অভাব ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত না করায় কাস্টমস কর্মকর্তারা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়াচ্ছে।
তাদের দুর্নীতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত,প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহিতার আলোকে আইনগত শাস্তি নিশ্চিত করা।একই সাথে দুর্নীতির সুযোগ তৈরী করে এমন কাঠামো পরিবর্তন অতীব জরুরি।